ব্যালন ডি’অর আর লিওনেল মেসি, দুটি নাম যেন বহু বছর ধরেই একই বাক্যে উচ্চারিত হয়ে আসছে। আটবার এই পুরস্কার জিতে রেকর্ড গড়া আর্জেন্টাইন তারকার হাতে নবম ট্রফি উঠবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। তবে ২০২৬ সালের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বয়সের হিসাব, ইউরোপ ছাড়ার বাস্তবতা কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীদের উত্থান, কোনোটিই যেন মেসির লড়াই থামাতে পারেনি।
সর্বশেষ ২০২৩ সালে ব্যালন ডি’অর জেতার পর তিন বছর কেটে গেছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ফুটবল ছেড়ে এমএলএসে পাড়ি দিয়েছেন তিনি। অনেকের ধারণা ছিল, সেখানেই হয়তো ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে মেসির অধ্যায় শেষ। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপসহ পুরো বছরের পারফরম্যান্স সেই ধারণাকে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এবার নবমবারের মতো ফুটবলের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার জেতার দৌড়ে মেসির দাবির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি কারণ রয়েছে। এমনই এক বিশ্লেষণ উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্রীড়া সাময়িকী স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
বিশ্বকাপে আবারও মেসি-জাদু
ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স বরাবরই বড় ভূমিকা রাখে। সেই জায়গায় মেসির পরিসংখ্যানও নজরকাড়া। ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপে ৮ গোলের পাশাপাশি ৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। ফাইনাল ছাড়া প্রতিটি ম্যাচেই সরাসরি গোলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
শিরোপা অবশ্য শেষ পর্যন্ত তার হাতে ওঠেনি। ফাইনালে হারের পর মেসিকে সিলভার বল নিয়েই ফিরতে হয়েছে। তবে বিশ্বকাপজুড়ে তার পারফরম্যান্স আবারও দেখিয়েছে, বয়স তার সৃজনশীলতা কিংবা ম্যাচে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতায় বড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলার মতো বিশ্বকাপ
শুধু ভালো খেলাই নয়, এবারের বিশ্বকাপে ব্যালন ডি’অরের অন্য দাবিদারদের তুলনায় মেসির পারফরম্যান্স কতটা উজ্জ্বল ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন করেছেন ৬ গোল। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে তার কাছ থেকে গোল আসেনি। স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালও বিশ্বকাপে করেছেন মাত্র একটি গোল। কিলিয়ান এমবাপ্পে কিছুটা কাছাকাছি থাকলেও তার দুটি গোল আসে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে।
অর্থাৎ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে যখন চাপ ছিল সর্বোচ্চ, তখন মেসিই ছিলেন আর্জেন্টিনার আক্রমণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
৩৯ বছরেও থামেনি বিস্ময়
মেসির বয়স এখন ৩৯। এই বয়সে অধিকাংশ ফুটবলারই ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে থাকেন। অথচ মেসি সেই বয়সেই বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে তরুণদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন।
তার পারফরম্যান্সের সবচেয়ে বড় বিস্ময় সম্ভবত এখানেই। বয়স যেখানে সাধারণত একজন ফুটবলারের গতি, ধার ও প্রভাব কমিয়ে দেয়, সেখানে মেসি যেন সেই স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে অবস্থান করছেন। বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স সেই দাবিকে আরও জোরালো করেছে।
এমএলএসে বদলে দিয়েছেন দৃশ্যপট
ব্যালন ডি’অর নির্ধারণে শুধু গোল-অ্যাসিস্ট নয়, একজন খেলোয়াড় তার দল ও প্রতিযোগিতায় কতটা প্রভাব ফেলেছেন, সেটিও বিবেচনায় আসে। আর এমএলএসে মেসির প্রভাব সেই জায়গায় আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে।
ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের জনপ্রিয়তা ও দর্শকদের আগ্রহ বাড়াতে তার ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি একটি লিগ ও দেশের ফুটবল সংস্কৃতিতে তার উপস্থিতি যে বড় প্রভাব ফেলেছে, সেটিও এবার ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় মেসির পক্ষে যেতে পারে।
সতীর্থ থেকে কিংবদন্তি, সবার সমর্থন মেসির পক্ষেই
মেসির ব্যালন ডি’অর দাবিকে জোরালো করেছে ফুটবল বিশ্বের একাধিক পরিচিত ব্যক্তির বক্তব্য। আর্জেন্টিনার সতীর্থ ক্রিস্টিয়ান রোমেরো সরাসরি বলেছেন, মেসির হাতেই পুরস্কারটি যাওয়া উচিত। তার মতে, মেসি অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত এই বিষয়ে খুব বেশি বিতর্কের জায়গা নেই।
অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারও মেসির বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সের প্রশংসা করে পুরস্কারটি তার প্রাপ্য বলে মত দিয়েছেন।
ইন্টার মায়ামির সহ-মালিক ডেভিড বেকহামও মেসির বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সকে অসাধারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যের সারকথা, ৩৯ বছর বয়সে এমন পারফরম্যান্স অত্যন্ত বিরল এবং ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকায় মেসির থাকা যথার্থ।
এমনকি আতলেতিকো মাদ্রিদের কোচ দিয়েগো সিমিওনে, যিনি এমবাপ্পে ও ইয়ামালের মতো তরুণ তারকাদের খুব কাছ থেকে দেখেছন তার পছন্দের জায়গায় রেখেছেন মেসিকেই। সিমিওনের যুক্তি, এই বয়সে বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্সই তার পক্ষে সবচেয়ে বড় দাবি।
সব মিলিয়ে মেসির নবম ব্যালন ডি’অর জয়ের পথ এখনো নিশ্চিত নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন আরও অনেক বড় তারকা। তবে বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, বয়সকে হার মানানো ধার, এমএলএসে প্রভাব এবং ফুটবল বিশ্বের পরিচিত মুখদের সমর্থন, এই পাঁচটি বিষয় মেসিকে আবারও ব্যালন ডি’অরের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।