দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশিদের অধিকার নিয়ে কথা বলায় হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় আত্মগোপনে রয়েছেন বিশপ রাফায়েল বাহেবওয়া।
তিনি বলেছেন, বিদেশিদের অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
আল–জাজিরাকে বাহেবওয়া বলেন, ‘আমি এখন আত্মগোপনে আছি। তারা বলছে, বিদেশিদের অধিকারের পক্ষে কথা বলায় আমাকে হত্যা করবে।
গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) থেকে শরণার্থী হিসেবে ২৬ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় এসেছিলেন বাহেবওয়া। এরপর থেকে দেশটিতে বিদেশিবিরোধী মনোভাবের বারবার উত্থান দেখেছেন তিনি। যে দেশকে নিজের আবাসভূমি হিসেবে ভেবেছিলেন, সেখানে এ বছরের পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভিন্ন বলে মনে করছেন তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে এ বছর অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেওয়া আন্দোলন ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।
এ সময়সীমাকে ঘিরে অভিবাসীদের মধ্যে নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অনিবন্ধিত বিদেশি নাগরিকদের দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। দাবি পূরণ না হলে আরও বিক্ষোভেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
তবে ডারবানে বসবাসরত বাহেবওয়া ও অন্য শরণার্থীদের কাছে বৈধ ও অবৈধ অভিবাসীর এই পার্থক্য খুব একটা স্বস্তি দিচ্ছে না।
তাদের ভাষ্য, রাস্তায় যে শত্রুতার মুখে পড়তে হয়, তা সাধারণত কাগজপত্র দেখতে চাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় না।
নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কা
দক্ষিণ আফ্রিকায় আগামী ৪ নভেম্বর স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনী প্রচারে অভিবাসন এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। গত কয়েক মাস ধরে বাহেবওয়া ছিলেন ডারবানের চে গুয়েভারা সড়কে অবস্থিত শরণার্থী গ্রহণকেন্দ্রের বাইরে ফুটপাতে রাত কাটানো কয়েক শ শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর একজন। তাদের অনেকেই ডিআর কঙ্গো ও বুরুন্ডি থেকে এসেছেন। অন্যদের মধ্যে ছিলেন উগান্ডা, মোজাম্বিক ও তানজানিয়ার নাগরিকেরা।
তাদের ভাষ্য, বিদেশিবিরোধী হামলার আশঙ্কায় নিজেদের এলাকা ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন তারা।
নিরাপত্তার আশায় তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (ডিএইচএ) কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ফুটপাতই হয়ে ওঠে তাদের আবাসস্থল।
প্রায় চার মাস ধরে নারী, পুরুষ ও শিশুরা খোলা আকাশের নিচে সেখানে রাত কাটিয়েছেন। বৃষ্টি-রোদসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে তাদের। খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য নির্ভর করতে হয়েছে নাগরিক সমাজের সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর।
বাহেবওয়া বলেন, ‘সময়টা খুব কঠিন ছিল। এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। ’
কয়েকজন অভিবাসী আল–জাজিরাকে জানান, একপর্যায়ে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। নিয়মিত খাবার ও ওষুধ পাওয়া যাচ্ছিল না। শিবিরে থাকার সময় যক্ষ্মায় আক্রান্ত এক ব্যক্তি মারা যান বলেও জানান তারা।
তবে ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পরিস্থিতি আল–জাজিরা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
যে শত্রুতার ভয়ে শরণার্থীরা নিজেদের এলাকা ছেড়েছিলেন, আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরেও সেই পরিস্থিতি থেকে তাদের রেহাই মেলেনি।
গত ৩ সেপ্টেম্বর মার্চ অ্যান্ড মার্চের সদস্যরা কেন্দ্রের বাইরে থাকা শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের মুখোমুখি হন। একপর্যায়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে। এ ঘটনায় অন্তত চারজন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যায়।
এর কয়েক দিন পর আরেকটি বিক্ষোভের সময় দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নেন পুলিশ সদস্যরা। উত্তেজনা বাড়তে থাকলে তারা দুই পক্ষের মধ্যে বাধা তৈরি করেন।
মার্চ অ্যান্ড মার্চ বলেছে, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য অনিবন্ধিত অভিবাসন, অপরাধ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকার অবনতিশীল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো।
অভিবাসন আইন প্রয়োগে সরকারের পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় বলে দাবি সংগঠনটির।
তাদের নেতারা বারবার বিদেশিবিদ্বেষী হওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাদের দাবি, সব বিদেশি নাগরিক নয়, বরং অনিবন্ধিত অভিবাসনই তাঁদের আন্দোলনের লক্ষ্য।
তবে বাহেবওয়া বলেন, বৈধ ও অবৈধ—দুই ধরনের অভিবাসীই এই শত্রুতার শিকার হচ্ছেন।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ডারবানের ওয়ারউইক স্ট্রিট মার্কেটের আশপাশের সেলুনে কাজ করা ছয় শরণার্থীকে লাঠি হাতে কয়েকজন ব্যক্তি মারধর করেন। জনস্বার্থবিষয়ক সংবাদমাধ্যম গ্রাউন্ডআপের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
বাহেবওয়া বলেন, আগের হামলাগুলোর পরও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সহায়তা পেতে অভিবাসীদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
তার অভিযোগ, ‘পুলিশ বলেছিল, আমরা বিদেশি বলে মামলা করতে পারব না। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। ’
এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে ওই নির্দিষ্ট অভিযোগের কোনো প্রকাশ্য জবাব পাওয়া যায়নি।
ফেরার মতো জায়গাও নেই
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে শরণার্থী গ্রহণকেন্দ্রের বাইরে গড়ে ওঠা অস্থায়ী শিবির সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার।
শরণার্থীদের সামনে দুটি বিকল্প দেওয়া হয়। হয় যে এলাকা ছেড়ে তাঁরা পালিয়ে এসেছেন, সেখানে ফিরে যেতে হবে, নয়তো ডারবান থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরে গাউতেং প্রদেশের লিন্ডেলা কেন্দ্রে অস্থায়ী আবাসন নিতে হবে। লিন্ডেলা সরকার পরিচালিত একটি অভিবাসন আটককেন্দ্র। বহিষ্কারের মুখে থাকা ব্যক্তিদের সেখানে রাখা হয়।
এ নিয়ে শরণার্থীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়।
লিন্ডেলায় যেতে ভয় পাচ্ছিলেন অনেকে। অভিবাসীদের আটক ও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে জড়িয়ে আছে কেন্দ্রটির নাম। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করছিলেন, ফুটপাতে আর থাকা সম্ভব নয়।
১৫ সেপ্টেম্বর ডারবান থেকে বাসে করে ২৭৪ জনকে লিন্ডেলায় নেওয়া হয়। অন্য প্রায় ১৫০ জন ডারবানেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা বিকল্প আবাসনের খোঁজ শুরু করেন।
তবে ফুটপাত ছেড়ে যাওয়ায় তাঁদের মূল সমস্যার সমাধান হয়নি। যে পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তারা সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই পরিস্থিতি এখনো তাঁদের তাড়া করছে।
ডিআর কঙ্গোর নাগরিক কাফুতি মুয়ুম্বা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি শরণার্থী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন। মুয়ুম্বা বলেন, অনেকেই এমন এলাকায় ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন, যেখানে তাঁরা ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন।
মুয়ুম্বা বলেন, মানুষ ভীত। তার অভিযোগ, ‘এমনকি পুলিশও মার্চ অ্যান্ড মার্চের সহিংসতা হতে দিচ্ছে। তারা লাঠি নিয়ে এসে বলছে, আমরাই নাকি তাদের ওপর হামলা করছি। ’
তিনি বলেন, কয়েক মাসের অস্থিরতায় অনেক শরণার্থী তাঁদের জীবিকা হারিয়েছেন। এখন তাঁরা থাকার জায়গা খুঁজতে মরিয়া।
মুয়ুম্বা বলেন, ‘বিদেশিবিদ্বেষের অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম নয়। ২০০৮ সালে এবং এরপর ২০১৫ সালেও আমরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম। ’
২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন শহরের বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বিদেশিবিরোধী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সহিংসতায় কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন এবং হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
পরবর্তী বছরগুলোতেও বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
মুয়ুম্বার কাছে অতীতের এসব স্মৃতি ৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমা ঘিরে দেওয়া বক্তব্যগুলোকে উপেক্ষা করা কঠিন করে তুলেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা পুলিশকে বিশ্বাস করি না। তারা আমাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করছে না। তাদের কেউ কেউ নিজেরাও বলছে, আমাদের চলে যেতে হবে। ’
পুলিশ জানিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমাকে কেন্দ্র করে তাদের স্বাভাবিক পুলিশি কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেই। বিক্ষোভকারীদের আইন মেনে চলতে হবে বলেও জানিয়েছে তারা।
মার্চ অ্যান্ড মার্চ বলেছে, তারা শুধু অনিবন্ধিত অভিবাসীদের দেশ ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে বলছে।
কিন্তু মুয়ুম্বা বলেন, ডিআর কঙ্গোতে ফিরে যাওয়া অনেক কঙ্গোলীয় শরণার্থীর জন্য বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প নয়।
তিনি বলেন, ‘সেখানে এখনো যুদ্ধ চলছে। ’
সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়াচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা
চলমান বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার জানিয়েছে, তারা অভিবাসন আইন প্রয়োগের কার্যক্রম জোরদার করেছে।
সরকারের অভিবাসনবিষয়ক আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ১৪ জুন থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত ৮৬ হাজার ৫৯৬ জন বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কার ও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে।
তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মালাউইয়ের নাগরিক। এরপর রয়েছেন জিম্বাবুয়ে ও মোজাম্বিকের নাগরিকেরা।
সরকারি তথ্য বলছে, নিজ দেশে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের ৯০ শতাংশ অবৈধভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবেশ করেছিলেন। আর ৯৫ শতাংশকে এমন ব্যক্তি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, যাঁরা সরকারি প্রবেশপথ ব্যবহার না করে সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন।
সরকারের ভাষ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং অভিবাসন আইন কার্যকর করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এসব অভিযান চালানো হচ্ছে।
একই সঙ্গে অভিবাসন আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে বেসরকারি গোষ্ঠীগুলোকে বারবার সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
মার্চ অ্যান্ড মার্চের ৩০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমার কোনো আইনি কর্তৃত্ব নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার বলেছে, সাধারণ নাগরিকেরা কাউকে দেশ থেকে বহিষ্কার করতে পারেন না।
তবে আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও এমন সময়সীমা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। এর আগে ৩০ জুনকে কেন্দ্র করে দেওয়া সময়সীমার ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল।
ডারবানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়ের বাইরে মাসের পর মাস ফুটপাতে রাত কাটানো শরণার্থীদের জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর তাই নতুন অনিশ্চয়তা নিয়ে এসেছে। তাঁদের জীবনে আগে থেকেই অনিশ্চয়তার কমতি নেই।
কেউ কেউ ডারবান থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছেন। অন্যরা যে এলাকাগুলো থেকে একসময় পালিয়ে এসেছিলেন, সেখানেই নতুন করে থাকার জায়গা খুঁজছেন।
তবে আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলা অভিবাসীদের মধ্যে একটি বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, বিদেশি হওয়ার কারণে যখন প্রথমেই ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হতে হয়, তখন কাগজপত্রের বৈধতা খুব বেশি সুরক্ষা দিতে পারে না।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ২৬ বছরের বেশি সময় কাটিয়েছেন বিশপ বাহেবওয়া। আপাতত তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। ৩০ সেপ্টেম্বর কী ঘটবে, তা তিনি জানেন না।
বাহেবওয়া বলেন, ‘বিদেশি হওয়ার কারণে আমাদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। ৩০ সেপ্টেম্বরেই এর শেষ হবে না। এর সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক রয়েছে। ’
সূত্র:আল-জাজিরা