মিয়ানমারের কারাগারে নারীরা অমানবিক নির্যাতনের শিকার

স্কাই নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে থাকা কারাগারগুলোতে রাজনৈতিক কারণে বন্দি নারীরা পদ্ধতিগত শারীরিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং চিকিৎসা অবহেলার শিকার হচ্ছেন বলে এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে মিয়ানমার রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। ফলে দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই সংঘাতের ফলে প্রায় এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩৫ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন।

নিউ ইয়র্কভিত্তিক এই মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যমতে, অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত আটক হওয়া ৩০ হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দির মধ্যে ৬৬০০ জনেরও বেশি নারী এবং ৬৪০ জন শিশু রয়েছে। বন্দি থাকা এই নারীদের তালিকায় মিয়ানমারের সাবেক নেত্রী অং সান সু চি-ও রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনটির এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক ব্রায়োনি লাউ জানিয়েছেন যে, মিয়ানমারে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে আটক থাকা নারীদের অভিজ্ঞতার যে চিত্র উঠে এসেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি প্রমাণ করে যে সেখানকার কারাগারগুলোতে বন্দিদের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট প্রদান এবং অবহেলা করাটা কেবল স্বাভাবিক ঘটনা নয়, বরং একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।

কারাগারে চলমান এই নির্যাতন ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে মিয়ানমারের সামরিক নিয়ন্ত্রিত সরকারের এক মুখপাত্রের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, ২০২৫/২৬ সালে তীব্র সমালোচনার মুখে আয়োজিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে সাবেক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এই সামরিক সমর্থিত সরকারটি গঠন করেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দিদের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালাতে কারাগার কর্তৃপক্ষ লাঠি, লোহার শিকল, মেটাল পাইপ এবং গুলতি ব্যবহার করে মারধর করে থাকে। এছাড়া অনেক বন্দিকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া, দীর্ঘসময় ধরে কষ্টদায়ক অবস্থায় বসিয়ে রাখা বা দাঁড় করিয়ে রাখা এবং চরম যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়।

২০২৫ এবং ২০২৬ সালে পরিচালিত ১৭ জন সাবেক নারী বন্দির সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, ত্রাণ ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্য ও আইনি পরামর্শকরা ছিলেন।

সাবেক বন্দিরা জানিয়েছেন, অপশাসন ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দমন করতে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিশেষ আইন এবং একটি কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ ফৌজদারি দণ্ডবিধির নানা ধারায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে না পারলেও এগুলো ২০২৫ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘ তদন্তকারীদের একটি প্রতিবেদনের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। জাতিসংঘের সেই প্রতিবেদনে মিয়ানমারের গণআটক কেন্দ্রগুলোতে মারধর, ইলেকট্রিক শক, শ্বাসরোধ করা, দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং যৌনাঙ্গে আগুন দেওয়াসহ নানা ধরনের ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের নথিভুক্ত প্রমান পাওয়া গিয়েছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অন্তত ৭৪ জন রাজনৈতিক বন্দি জঘন্য জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে আটক অবস্থায় মারা গেছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে সাবেক বন্দিরা নিশ্চিত করেছেন যে গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে কারাগার কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে রাখে। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারীদেরও চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয় না, যার ফলে অনেককে জেলখানার সেলের ভেতরেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হতে হয়।

এক সাবেক নারী বন্দি নিজের নির্মম অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, কারাগারে কোনো আল্ট্রাসাউন্ড বা চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় তার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ জানার উপায় ছিল না। রাত ১২টায় তার ওয়াটার ব্রেক হলেও পরদিন সকাল ১০টার আগে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুমতিপত্র আসেনি। এমনকি সন্তান প্রসবের ঠিক পরপরই তার পায়ে পুনরায় লোহার শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সূত্র: রয়টার্স

এই পোস্ট টি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Skynews24.net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com