শিরোনাম
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লুটেপুটে খাচ্ছে দুর্নীতিবাজ মোঃ রাশেদুল হক ছেলেকে জিম্মি করে মাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালকের সম্পত্তি ক্রোক-পরোয়ানা, তারপরও বহাল তবিয়তে দিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার আসাদ আলম, অনুমোদন দিল ভারত কৃষি তথ্য সার্ভিসে বেপরোয়া সিন্ডিকেট সরকারি হাসপাতালের সামনে নতুন ক্লিনিকের অনুমোদন নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জনগণের সহনশীলতা চাইলেন তথ্য উপদেষ্টা ডিজেল বিক্রিতে এখনও ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে : রিজভী উপাচার্য পরিবর্তনের প্রতিবাদে চুয়েটে শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক শাটডাউন সম্মুখসারির যোদ্ধাদের জন্য খাবার বানিয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন ইয়েমেনি নারীরা

সম্মুখসারির যোদ্ধাদের জন্য খাবার বানিয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন ইয়েমেনি নারীরা

স্কাই নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভোরের আলো ফুটতেই বড় বাটি সামনে নিয়ে ময়দা মাখতে শুরু করেন নাসিম আল-ওদাইনি ও তার সহযোদ্ধা নারীরা। চুলায় আগুন জ্বেলে খেজুরভরা পেস্ট্রি ও বিস্কুট তৈরি করছেন তারা। এসব খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে থাকা যোদ্ধাদের কাছে। খাবারের সঙ্গে যাবে একটি বার্তাও, ‘নারীরা তোমাদের পাশে আছে।’

ইয়েমেনে তীব্র সংঘাতের সময় সরকারি বাহিনীর যোদ্ধাদের সহায়তায় বহু বছর ধরে রান্নাঘরে খাবার প্রস্তুত করে আসছেন নারীরা। এবার তাইজ প্রদেশে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় পুরোনো সেই উদ্যোগ আবারও শুরু করেছেন তারা।

নাসিম আল-ওদাইনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ২০১৫ সালে আমরা এই উদ্যোগ শুরু করেছিলাম। তবে লড়াই কমে যাওয়ায় চার বছরেরও বেশি সময় এটি বন্ধ ছিল। তাইজ প্রদেশে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার পর এখন আমরা এটি আবার চালু করেছি।

গত ৩ সেপ্টেম্বর হুতি বাহিনী হোদেইদা ও তাইজ প্রদেশে সরকারি বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। এতে হোদেইদার অবশিষ্ট জেলাগুলো, মোখা শহর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে তারা।

তাইজের পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে এখনো তীব্র লড়াই চলছে। সেখানে হুতি বাহিনী সামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাইজ শহরের পূর্ব ফ্রন্টেও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।

নাসিম মনে করেন, যোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া শহরের নারীদের দায়িত্বের অংশ। নিজের সঞ্চয়ের পাশাপাশি পরিচিতজন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারীদের অনুদানে বিপুল পরিমাণ পেস্ট্রি ও বিস্কুট তৈরি করছেন তিনি।

নাসিম বলেন, আগের তুলনায় এখন আমাদের সহায়তার পরিধি অনেক বেড়েছে। তাইজের ভেতর ও বাইরে থেকে অনেক নারী অংশ নিতে আগ্রহী। চার বছরেরও বেশি সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর এতটা সমর্থন পাব, তা আমি ভাবিনি। সত্যিই অবাক হয়েছি।

নিরাপত্তার জন্য অপরিচিত কোনো উৎস থেকে প্রস্তুত খাবার গ্রহণ করেন না তারা। বরং দাতাদের নির্ভরযোগ্য বিক্রেতার কাছ থেকে ময়দা, রান্নার তেলসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে তার রসিদ দিতে বলা হয়।

সম্মুখসারিতেও যান নারীরা

অনেক নারী নির্ভরযোগ্য মাধ্যমের মাধ্যমে যোদ্ধাদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠান। তবে নাসিমের মতো কেউ কেউ নিজেরাই সম্মুখসারিতে গিয়ে সেগুলো পৌঁছে দেন।

নাসিম বলেন, ২০১৫ সাল থেকে এই উদ্যোগের সহকর্মীরা ও আমি নিজেরাই সম্মুখসারিতে গিয়ে যোদ্ধাদের হাতে খাবার পৌঁছে দিয়েছি। আমার তিন সহকর্মী সম্মুখসারিতে নিহত হয়েছেন। এরপরও আমি নিজে খাবার পৌঁছে দেওয়া চালিয়ে গেছি।

তিনি জানান, মোমেন, ওসামা ও রেহাম ছিলেন এই খাদ্য সহায়তা উদ্যোগের সক্রিয় সদস্য। সম্মুখসারিতে সরবরাহ পৌঁছে দিতে গিয়ে তারা নিহত হন।

নাসিম বলেন, সম্মুখসারিতে গিয়ে যখন দেখি যোদ্ধারা প্রচণ্ড রোদ ও কনকনে ঠান্ডার মধ্যে টিকে আছেন, তখন মনে হয় তাদের জন্য বিস্কুট বানানো ও সংরক্ষিত খাবার প্রস্তুত করা অন্তত আমি করতে পারি।

সহকর্মীদের মৃত্যুও নাসিমকে থামাতে পারেনি। বরং তাদের অসমাপ্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প আরও দৃঢ় হয়েছে তার।

গত সপ্তাহে সম্মুখসারিতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, আমি পৌঁছানোর পর তারা খুব আনন্দিত হয়েছিল। তারা বলছিল, বিস্কুটের চেয়ে তোমাদের এখানে উপস্থিতি আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতে আমরা বিশাল মানসিক সমর্থন পাই।

তবে নাসিম মনে করেন, সংঘাতে নারীদের ভূমিকা শুধু সম্মুখসারিতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি বলেন, যুদ্ধে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অনেক নারী পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছেন এবং পরিবার চালাতে বাধ্য হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন।

‘পুরো শহর তাদের পাশে’

ইসরা আল-তাইয়েবের মা তুফাহা ২০১১ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় তাইজের ফ্রিডম স্কয়ারে নিহত হন।

নাসিমের মতো তাইয়েবও ২০১৫ সালে যোদ্ধাদের জন্য খাবার তৈরি শুরু করেছিলেন। ২০২২ সালে সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর আবারও কাজ শুরু করেছেন তিনি। এবার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে তার উদ্যোগ।

তাইয়েব মিডল ইস্ট আইকে বলেন, সব জায়গা থেকে নারীরা আমাদের সহায়তা করছেন। আমরা যোদ্ধাদের বিস্কুট, দুধ, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিচ্ছি। আজ আমাদের প্রায় বিরতিহীন কাজের ষষ্ঠ দিন। কিন্তু আমরা ক্লান্তি অনুভব করছি না, কারণ জানি এই খাবার তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, যাদের এটি প্রয়োজন।

নাসিমের মতো তাইয়েব নিজে সম্মুখসারিতে যান না। বরং বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সরবরাহ পাঠান। চাহিদা বেশি থাকায় পুরো কার্যক্রম পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তাইয়েব বলেন, কেউ নগদ অনুদান সংগ্রহ ও বাজার থেকে উপকরণ কেনার দায়িত্বে, কেউ খাবার তৈরি ও প্যাকেট করার দায়িত্বে, আরেকটি দল সম্মুখসারিতে সেগুলো পৌঁছে দেয়।

যেসব নারী নিজেরা রান্না বা বেকিং করতে পারেন না, তারাও আর্থিক সহায়তা দেন। এসব অনুদানের অর্থে একটি ছোট রান্নাঘর থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তাইয়েব ও তার দল।

তিনি বলেন, আমরা বুঝতেই পারিনি যে এতটা সহায়তা দিতে পারব। কিন্তু অনুদান আসতে থাকায় আমরা কাজের পরিধি বাড়াতে পেরেছি।

সম্মুখসারি থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়াও তাইয়েবকে কাজ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করছে। তিনি বলেন, এই বিস্কুট, দুধ ও পানি যোদ্ধাদের মনে করিয়ে দেয় যে পুরো শহর তাদের পাশে আছে। তাই আমরা কাজ চালিয়ে যাব।

শুধু তাইজ প্রদেশেই নয়, ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকাতেই যোদ্ধাদের জন্য নারীদের খাবার প্রস্তুত করার প্রচলন রয়েছে। হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাতেও বিশেষ করে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে যোদ্ধাদের জন্য নারীরা খাবার তৈরি করেন।

মানসিকভাবে শক্তি জোগায় খাবার

পুরুষরাও সম্মুখসারিতে থাকা যোদ্ধাদের খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী, কম্বল, পানি, দুধসহ বিভিন্ন মৌলিক সামগ্রী দিয়ে সহায়তা করছেন। তাদের এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য যোদ্ধাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা।

পশ্চিম তাইজ শহরের এক যোদ্ধা, ছদ্মনাম আহমেদ, বলেন, সম্মুখসারির ইউনিটগুলো এ সহায়তায় খুশি। সহজে বহনযোগ্য ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়; এমন খাবার তাদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এটি বড় ধরনের মানসিক শক্তিও জোগায়।

আহমেদ মিডল ইস্ট আইকে বলেন, যখন দেখি খাবারভর্তি একটি গাড়ি সম্মুখসারিতে এসে পৌঁছেছে, তখন মনে হয় পুরো প্রদেশ আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আমরা একা নই।

তিনি বলেন, সাধারণত বেসামরিক মানুষ নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যান। তবে কেউ কেউ থেকে গিয়ে সেনাদের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে সহায়তা করেন।

আহমেদ বলেন, আমরা সবাই এই প্রদেশের মানুষ এবং সবারই একটি ভূমিকা রয়েছে। আমরা যখন সম্মুখসারিতে লড়ছি, অন্যরা আর্থিকভাবে সহায়তা করছেন। আর নারীরা ঘরে বসে থাকছেন না; তারা আমাদের জন্য খাবার বানাচ্ছেন।

মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ হাইল আল-ফাকিহ মনে করেন, বাড়িতে তৈরি খাবারের আবেগগত গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ প্রস্তুত খাবার কেনা বা শুধু অর্থ সহায়তা দেওয়ার তুলনায় ঘরে তৈরি খাবার যোদ্ধাদের সঙ্গে তাদের ঘরের একটি গভীর সংযোগ তৈরি করে।

তিনি বলেন, এই বিস্কুট সম্মুখসারির যোদ্ধাকে মানসিকভাবে তার ঘরের সঙ্গে যুক্ত করে। এটি একটি শক্তিশালী বার্তা দেয় যে শহরের মানুষ তাদের পাশে রয়েছে। এটি শুধু বস্তুগত সহায়তার চেয়েও অনেক বেশি।

ফাকিহ আরও বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ এই চর্চা। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নারীরা ঐতিহাসিকভাবে যুদ্ধের সময় যোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে বাড়িতে খাবার তৈরি করে আসছেন।

সূত্র : মিডলইস্ট আই

এই পোস্ট টি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Skynews24.net
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com