রাষ্ট্রায়ত্ব জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে (এমপিএল) তীব্র প্রশাসনিক অরাজকতা, পদোন্নতি ও বদলিতে অনিয়ম, আধুনিকায়নে স্থবিরতা এবং জ্বালানি তেল চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম পিএলসি-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (এমআই) মোঃ রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে।
মো. রাশেদুল হক প্রায় ১৫ বছর ধরে একই স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাশেদুল হক ১-১১-২০১২ তারিখে যোগদান করেন। কোম্পানির সার্ভিস নীতিমালা অনুযায়ী সাধারণ শাখার সপ্তম গ্রেড অফিসার পদের জন্য প্রথম বিভাগে মাস্টার্স ও তিন বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও ক্যাটাগরি শাখায় দুই গ্রেড উপরে পঞ্চম গ্রেডে বিএসসি পাস পদের জন্য ভুয়া সনদের মাধ্যমে ছাড় দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এতে কাজের গতিশীলতা ব্যাহত হয়েছে। শুধু তাই নয়, ২৫-১১-২০২১ তারিখে কোম্পানির পদোন্নতি নীতিমালার ১৪.১ এবং ১৪.৩ ধারা লঙ্ঘন করে, বিভাগীয় শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রভাব ও অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে চারজন কর্মকর্তাকে সরাসরি ম্যানেজার পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ও অনৈতিক অর্থ লেনদেনে ৪ জন কর্মকর্তাকে সরাসরি ম্যানেজার বানায় তৎকালীন প্রশাসন। এই অভিযোগগুলোর সঠিকতা ও নথিপত্র যাচাই করে জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়েছে।
একই কর্মস্থলে এত দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান বদলি নীতিমালার পরিপন্থী এবং এটি প্রশাসনের ভেতরে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে বাণিজ্য, ডিপো থেকে মাসিক চাঁদা আদায়, মামলা পরিচালনায় অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল তৈরি করে টাকা আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি কোম্পানির গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ভাড়ায় ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করার অভিযোগও রয়েছে।
নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্য, ডিপো থেকে মাসিক লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়, মামলা পরিচালনা থেকে অর্থ আত্মসাৎ, ভূয়া বিল তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ, ও কোম্পানির গাড়ি বিভিন্ন জায়গায় ভাড়ায় খাটিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় ও প্রতি মাসে ডিপোগুলো থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযো ওঠেছে মোঃ রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজেকে ছাত্রলীগের বড় নেতার পরিচয় দিত। ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে অনেকেই তার বিরুদ্ধে মুখ খোলা শুরু করেছে। তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে অফিসে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শতশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গড়ে তুলেছেন টাকার পাহাড়। অবৈধ টাকায় নিজ এলাকা হাটহাজারিতে গড়েছেন বিলাসবহুল বাড়ি, কিনেছেন দামি গাড়ি, । এছাড়া স্ত্রী এবং সন্তানদের নামে রয়েছে মোটা অংকের এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র।মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের (এমপিএল) অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম/অপা.) মুজিবুর রহমান চৌধুরীর সাথে ভাগবাটোয়ারা করে সেই টাকার ভাগ সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ থেকে শুরু করে কোম্পানির সিবিএ নেতাদেরকেও পৌঁছে দেয়া হতো।
ওসি অর্থাৎ বাল্ক ইনচার্জ থাকার সময় তিনি কোটি কোটি টাকার তেল চুরি করে গড়ে তুলছেন সম্পদের পাহাড়।
নিয়োগ দুর্নীতি ও ভুয়া সনদের অভিযোগ: রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি হলো তাঁর নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়ে।২০১২ সালের ১ নভেম্বর ওনার যোগদানের সময় কোম্পানির সাধারণ শাখার ৭ম গ্রেড (অফিসার) পদের জন্য ১ম বিভাগে মাস্টার্সসহ ৩ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগ উঠেছে, তিনি কারিগরি শাখার ২ গ্রেড ওপরে (৫ম গ্রেড) ভুয়া সনদে বিএসসি পাস দেখিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পান। এছাড়া ২০২১ সালের নভেম্বরের কোম্পানির পদোন্নতি নীতিমালার ১৪.১ এবং ১৪.৩ নম্বর ধারা চরমভাবে লঙ্ঘন করে রাশেদুল হককে পদোন্নতি দেওয়া হয় বলেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
তেল চুরি ও অপচয় সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার অভিযোগ: চট্টগ্রামের পতেঙ্গা প্রধান স্থাপনা (Main Installation) হচ্ছে তেল সংরক্ষণ ও বিতরণের মূল কেন্দ্র। তথ্যমতে, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের উপ-মহাব্যবস্থাপক (পরিচালন) মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং মেইন ইনস্টলেশনের ব্যবস্থাপক হিসেবে মোঃ রাশেদুল হকের নাম একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের মূল হোতা । অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় ও সহায়তায় পতেঙ্গা প্রধান স্থাপনা থেকে দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরি, অবৈধ তেল পাচার ও তেলের অপচয়ের মতো প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম চলে আসছে।
অর্থ আত্মসাৎ ও সিন্ডিকেট গঠন: মেঘনা পেট্রোলিয়ামের তেল বিপণন ও বিভিন্ন ডিপোর কার্যক্রমে প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করার অভিযোগও ওনার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিপো থেকে নিয়মিত মাসিক চাঁদা আদায় হতো এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেটি রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে গোপনে করা হতো। তবে তারা নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়েছেন।
তার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট তেল চুরির অবৈধ কারবারের সাথে যুক্ত বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনো আছেন বহাল তবিয়তে। তিনি এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মী , আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় চোরা কারবারিদের সাথে মিশে জ্বালানি সংকটকালে শত শত কোটি টাকা লুটপাট করেছেন।
চাকরির অন্তরালে তেল চুরি তেল পাচার ও তেলে ভেজাল দেওয়াই হচ্ছে তার প্রধান কাজ বলে মন্তব্য করেন নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এক কর্মকর্তা।
কোম্পানির ভেতরে অভিযোগ উঠলেও অতীতে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব ব্যবহার করে বেশ কয়েকবার তদন্ত প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
জরুরি হস্তক্ষেপ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের টেকসই উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদায়নের দাবি উঠেছে।
আন্দোলনরত ও ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন:
“উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পেছনে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে প্রচলিত আইন ও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে সরকারের অবিলম্বে জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে দুদকের এক উপ-পরিচালক বলেন, “যদি কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায় বা পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক প্রমাণ মেলে, তাহলে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,“একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে যদি তার সম্পদের পরিমাণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেটি দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।”