গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ব্যক্তিগত জীবনে অসদাচরণের অভিযোগ তুলেছেন তার প্রথম স্ত্রী। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে আবেদন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি প্রকল্প, বদলি, পদোন্নতি ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন প্রকৌশলী বদরুল আলম খান। পাশাপাশি নিজস্ব প্রভাব বলয় ব্যবহার করে অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে তিনি শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
বিশেষ মহলের ছত্রছায়ায় থেকে অধিদপ্তরে নিয়োগ,বদলি,পদোন্নতি ও ঠিকাদার নিয়োগে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিজস্ব ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গণপূর্তের দরপত্র কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন।
বদরুল আলম খানের প্রথম স্ত্রী মিসেস জেসমিন অভিযোগ করেন, তার অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে। এছাড়া একাধিক মেয়ের সাথে সর্ম্পক। আমার অনুমোতি না নিয়ে ২য় বিয়ে করেছে।
এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। তার দুই স্ত্রী রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে পারিবারিক সমস্যা চলছে। এক স্ত্রী তার বিরুদ্ধে নারী সংক্রান্ত অভিযোগ, নির্যাতন ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ করেছেন বলেও জানান তিনি।
প্রথম স্ত্রীর অভিযোগ, সরকারি চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘন করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ওই প্রকৌশলী। ব্যক্তিগত জীবনেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
অভিযোগকারী আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর তদন্ত হয়নি।
বর্তমানে তিনি ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১ এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি ২১তম বিসিএস গণপূর্ত ক্যাডারের কর্মকর্তা। অভিযোগে বলা হয়েছে, অধিদপ্তরের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও দরপত্র কার্যক্রমে তার প্রভাব রয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের নাতি এবং ফ্যাসিবাদের আরেক মন্ত্রী র আ ম ওবায়দুল মোক্তাদীর চৌধুরীর ভাগিনা সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের আস্তাভাজন এবং বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের অত্যন্ত কাছের কর্মকর্তা হওয়ার কারণে তদন্ত করা হচ্ছে না।
এমনকি সময়ে অসময়ে কারণে-অকারণে আত্মীয়তা পাতান ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের ভাতিজা তিনি। পরবর্তীতে সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের নাতি। আওয়ামী লীগের আরেক মন্ত্রী র আ ম ওবায়দুল মোক্তাদীর চৌধুরীর ভাগিনা তিনি।
বর্তমান গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের বড় কুটুম। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের অত্যন্ত কাছের লোক। প্রধান প্রকৌশলীকে এই পদে তিনিই বসিয়েছেন বলে সহকর্মী প্রকৌশলীদের কাছে দম্ভ করে বলে থাকেন। তিনি যা বলেন সচিব তাই করেন বলে- প্রকৌশলী বদরুল আলম নিজে নিজে অহংকার বোধ করেন। গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৭ থেকে জারিকৃত এক প্রঞ্জাপনে তাকে ঢাকা গণপূর্ত-১ নং সার্কেলে বদলী করা হয়। এই সার্কেলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (কুমিল্লা) ওসমান গনিকে সুপারিশ করেছিলেন সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম।
বিষয়টি গোপন মাধ্যমে জানতে পেরে একজন রাজনৈতিক নেতাকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ঘুষ দিয়ে তাকে দিয়ে তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টাকে ম্যানেজ করে সচিবকে ফোন করান বদরুল। এর ফলে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে এমন একটি বদলী আদেশ হয়। এ নিয়ে তোলপাড় হয় গোটা গণপূর্ত অধিদপ্তর। উপহারস্বরূপ তাহেরের নির্বাচনী খরচ বাবদ গত ১০ ফেব্রুয়ারী রাতে গাড়ি ভর্তি করে ১কোটি টাকা পাঠান প্রকৌশলী বদরুল। পূর্ত ভবন থেকে সাভার সার্কেলের লাল গাড়িতে করে ওই দিন সন্ধার পরে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাহেরের বাসায়। প্রকৌশলী বদরুল মনে করেছিলেন জামায়াত নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি পাল্টে গেলে প্রকৌশলী বদরুল আলম মির্জা আব্বাসের বাসায় গিয়ে দেখা করেন তিনি (আব্বাস) পূর্ত মন্ত্রী হচ্ছেন এমন ভেবে। এখন তিনি নিজ সিন্ডিকেটের লোকজন নিয়ে বর্তমান পূর্ত মন্ত্রীকে ম্যানেজ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ বলা হয়, স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা প্রকৌশলী বদরুল আলম খান ২০০৩ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসাবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন। এরপর পদোন্নতি পেয়ে সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার (এসডিই) হয়েই ঠিকাদারি-বদলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে রাতারাতি নামে-বেনামে শত কোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি।
চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ে এভাবে লুটপাটের সাম্রাজ্য কায়েম করে অর্জন করা অবৈধ সম্পদের মধ্যে রয়েছে- তার স্ত্রীর নামে ঢাকার মালিবাগে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, খিলগাঁওয়ের গোড়ানে ৬তলা বিলাশবহুল বাড়ি, আশুলিয়ায় গার্মেন্টস্ এক্সেসরিজ কারখানা, আপন ভাইয়ের সাথে যৌথভাবে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা, নামে-বেনামে বিভিন্ন লাইসেন্সের মাধ্যমে পরোক্ষ ঠিকাদারী ব্যবসা, স্ত্রী ও ভাই-ভাতিজা শালা-শালির নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২০ কোটি টাকার এফডিআর, রাজধানীর গুলশানে নিজ নামে একটি ও স্ত্রীর নামে দুটি বিলাসবহুল আবাসিক ফ্ল্যাটের মালিকানা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ১০ কাঠার তিনটি প্লটসহ বিভিন্ন দেশে হরেক রকম বিনিয়োগ।স্বৈরাচার সরকারের ২য় টার্মে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে তিনি ২০১৪ সালে তৎকালীন মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের কাছে তদবির করিয়ে ভোলায় লোভনীয় পোস্টিং বাগিয়ে নেন।
সেখানে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৫বছরের চাকরি জীবনে তিনি তোফায়েল আহমেদের ভাতিজা এমপি মইনুল হোসেন বিপ্লব, এমপি আলী আজম মুকুল ও নুরুন্নবী শাওন এমপির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে লুটেরা সিন্ডিকেট গঠন করে সিজিএম আদালত ভবন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, পুলিশ বিভাগের নতুন থানা নির্মাণ, জেলা ও উপজেলা টিটিসি, উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সকল দরপত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে কমিশন বাণিজ্যে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়াও তিনি ভোলা গণপূর্ত বিভাগের মেরামত রক্ষনাবেক্ষণ কাজ থেকে ১৫ শতাংশ হারে ঘুষ আদায় করেও বড় অংকের অর্থ লোপাট করেন।
আওয়ামীলীগ সরকারে আমলে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরীর মাধ্যমে বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে ২০২০ সালে প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের কাছে তদবির করে ময়মনসিংহে বদলী করেন। পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে চট্টগ্রাম ১নং গণপূর্ত সার্কেলে থাকালীন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আরো কয়েক কোটি টাকা লোপাট করেন। এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান গণমাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি মিমাংসা জন্য আলোচনা চলছে। সব অভিযোগ সঠিক নয়।