সওজে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)-এর শীর্ষ পর্যায়ে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সওজের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মাইনুল হাসান এবং ফেনী জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা। নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণ, কোটি কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন, বিদেশে অর্থ পাচার এবং প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলোর নজরে বিষয়টি এসেছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সওজের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা বদলি ও পোস্টিং নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়ন করা হয় এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়। অভিযোগ রয়েছে, ফেনী জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা এই সিন্ডিকেটেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কুমিল্লা থেকে ফেনীতে পোস্টিং পেতে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি নিজস্ব বলয় তৈরি করে সওজের ফেনী কার্যালয় কার্যত নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।
স্থানীয় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ফেনীতে সড়ক নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারি কাজ পেতে হলে নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ হতে হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, নিম্নমানের কাজেও বিল ছাড় এবং অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে সুনীতি চাকমা অল্প সময়ের মধ্যেই অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সুনীতি চাকমার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশে তিনি অর্থ পাচার করেছেন এবং সেই অর্থ দিয়ে বাড়ি ও সম্পদ ক্রয় করেছেন। তার সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনা করানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তার আয়-ব্যয়ের সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না, যা বিষয়টিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন সুনীতি চাকমার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেলেও, সেই তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রক্রিয়াকে ধীরগতির করতে এবং প্রভাবিত করতে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টাও করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে সময় ক্ষেপণের কৌশল নিচ্ছেন।
এই পুরো ঘটনার সঙ্গে সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মাইনুল হাসানের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুতর আকার ধারণ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, সুনীতি চাকমার উত্থানের পেছনে প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মাইনুল হাসানের প্রত্যক্ষ আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং সেই সম্পর্কের সুযোগ নিয়েই সুনীতি চাকমা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
সৈয়দ মাইনুল হাসান ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি বুয়েটের ছাত্র থাকাকালীন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য হন এবং ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি)-এর ২০২২ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের প্যানেল থেকে নির্বাচন করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সেন্ট্রাল কাউন্সিল মেম্বার নির্বাচিত হন। তার এই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিচয় তাকে প্রশাসনের ভেতরে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে সৈয়দ মাইনুল হাসান ১৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পান। ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি তিনি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালের ২ জুলাই তিনি সওজের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, এই পদে থাকার সময় তিনি নিজের অনুগত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়ন করেছেন এবং অনিয়ম-দুর্নীতির একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।
বিশ্বস্ত সূত্রগুলো বলছে, সুনীতি চাকমার মাধ্যমে উপার্জিত অবৈধ অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচারের পরিকল্পনায় সৈয়দ মাইনুল হাসান অবগত ছিলেন এবং পরোক্ষভাবে এতে সহায়তা করেছেন। যদিও এই অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন, তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বিদেশে পাচার বা বেনামে হস্তান্তর করা হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অতীতে সওজ ও অন্যান্য দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হলেও সৈয়দ মাইনুল হাসান এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—শীর্ষ পর্যায়ের এই কর্মকর্তারা কি আইনের ঊর্ধ্বে? সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক সময়ে গ্রেফতার ও সম্পদ জব্দ করা না গেলে তদন্ত কার্যক্রম অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে একাধিকবার প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মাইনুল হাসানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান। কখনো সাক্ষাৎকার দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, আবার অনেক সময় ফোন রিসিভও করেননি। একইভাবে সুনীতি চাকমার পক্ষ থেকেও অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর দাবি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং জড়িতদের দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকার দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছে দেশবাসী। তদন্তের অগ্রগতি ও নতুন তথ্য জানাতে পাঠকদের সঙ্গে থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
Tag :