নিজস্ব প্রতিবেদক : সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. আহসান হাবীব—এমন তথ্য উঠে এসেছে একাধিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা দুর্নীতি, অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি একাধিক হত্যা মামলার আসামিও তিনি।
অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে যোগদানের পর থেকেই প্রকৌশলী আহসান হাবীবের প্রভাব বাড়তে থাকে। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে অধিকাংশ উন্নয়ন কাজের দরপত্র নিজ পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এমনকি তার বিরুদ্ধে বিদেশে শতকোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একসময় তার বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের প্রমাণও পেয়েছিল বলে জানা গেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আহসান হাবীব আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বিভাগে তার নিজস্ব একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। তার বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ প্রকাশিত হলে তা দ্রুত ‘ম্যানেজ’ করার ব্যবস্থাও তিনি করে থাকেন।
আরও জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পক্ষে অর্থ ও রসদ সরবরাহ করেছিলেন আওয়ামী লীগ আমলের এই প্রভাবশালী কর্মকর্তা। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলেও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত আহসান হাবীব এখনো বহাল তবিয়তে কর্মস্থলে রয়েছেন। তিনি রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলার আসামি, যার মামলা নম্বর ৮৭৪। ওই মামলায় তিনি ৭০ নম্বর আসামি।
মামলার নথি অনুযায়ী, কে এম শাহরিয়ার শুভ বাদী হয়ে গত ৩১ অক্টোবর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আহসান হাবীবসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করার আবেদন করেন। আদালত পল্টন মডেল থানাকে একই ধরনের আর কোনো মামলা আছে কি না—সে বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন এবং পরে আবেদনটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।
পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একই ঘটনায় এর আগেও পল্টন মডেল থানায় আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে একই অভিযুক্তদের নাম রয়েছে। ওই মামলাটি ৩০২/৩৪ ধারায় রুজু করা হয়।
সূত্র জানায়, হত্যা মামলার আসামি হওয়ার পর থেকেই মামলার বাদীর ওপর চাপ সৃষ্টি ও আর্থিক প্রলোভনের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছেন আহসান হাবীব। অভিযোগ রয়েছে, এই মীমাংসা প্রক্রিয়ায় প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকেও ভূমিকা রাখা হচ্ছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় আহসান হাবীব নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করেন। ছাত্র-জনতা হত্যার অভিযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত অর্থের জোরে মামলা থেকে নিজের নাম বাদ দিতে সক্ষম হবেন—এমন বিশ্বাস তার রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য আহসান হাবীবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।